ঢাকা    মঙ্গলবার, ০৩ নভেম্বর ২০২৬, ১৯ কার্তিক ১৪৩৩
বাংলা ইনসাইড

‘পারস্পরিক আস্থা’ অর্জনের পর প্রধানমন্ত্রীর ভারত সফর অনুষ্ঠিত হতে পারে: হুমায়ুন কবির


প্রকাশ : ২০ আগস্ট ২০২৬ | প্রিন্ট সংস্করণ | ফটো কার্ড

‘পারস্পরিক আস্থা’ অর্জনের পর প্রধানমন্ত্রীর ভারত সফর অনুষ্ঠিত হতে পারে: হুমায়ুন কবির
প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্র বিষয়ক উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির। ফাইল ছবি

প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্র বিষয়ক উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির বলেছেন, তাড়াহুড়ো করে নয়; বরং দুই দেশের মধ্যে পারস্পরিক আস্থা, বিশ্বাস, সার্বভৌমত্বের প্রতি শ্রদ্ধা, কূটনৈতিক আলাপ-আলোচনা এবং সম্মানজনক আমন্ত্রণ প্রস্তাবের ভিত্তিতে উপযুক্ত পরিবেশ তৈরি হলেই প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ভারত সফর অনুষ্ঠিত হতে পারে।

তিনি জানান, আগামী ১২-১৩ সেপ্টেম্বর ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লিতে অনুষ্ঠেয় ব্রিকস সম্মেলনের আগে প্রধানমন্ত্রীর সফর নিয়ে ভারতীয় গণমাধ্যমে গুঞ্জন থাকলেও সুনির্দিষ্ট জাতীয় স্বার্থ ও ঐকমত্য ছাড়া বাংলাদেশ এই মুহূর্তে কোনো তাড়াহুড়ো না করার নীতি গ্রহণ করেছে। 

গত ১৭ আগস্ট রাজধানীর মিন্টু রোডের সরকারি বাসভবনে রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা বাসস’কে দেওয়া একান্ত বিশেষ সাক্ষাৎকারে প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্র উপদেষ্টা ও বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব (আন্তর্জাতিক বিষয়ক) হুমায়ুন কবির এসব কথা বলেন। 

সাক্ষাৎকারে তিনি ভারত-বাংলাদেশ দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক, নতুন আন্তর্জাতিক জোটের সমীকরণ, যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের সাথে কৌশলগত সম্পর্ক, মালয়েশিয়ায় বন্ধ থাকা শ্রমবাজার চালু, পররাষ্ট্রনীতির মূল অগ্রাধিকারগুলোর অগ্রগতি নিয়ে বিস্তারিত কথা বলেন। আরও পড়ুনআরও পড়ুন২৩তম রাষ্ট্রপতি হলেন মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর

পারস্পরিক আস্থা ও ভারত সফর

ভারতীয় গণমাধ্যমে প্রচারিত প্রধানমন্ত্রীর সফর সংক্রান্ত খবরগুলোকে জল্পনা-কল্পনা আখ্যা দিয়ে পররাষ্ট্র উপদেষ্টা বলেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ভারত সফর নিয়ে ভারতীয় গণমাধ্যমের খবরগুলো ভিত্তিহীন ও অনুমাননির্ভর। দুই দেশের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক ও বাংলাদেশের সরকারপ্রধানের শীর্ষ পর্যায়ের সফরের বিষয়টি ভারতের বর্তমান নেতৃত্বের মাইন্ডসেট (মানসিকতা) বা দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তনের ওপর নির্ভর করছে। দেড় হাজারের বেশি মানুষের আত্মত্যাগের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশে সংঘটিত জুলাই গণঅভ্যুত্থানের বাস্তবতাকে প্রতিবেশী দেশকে সঠিকভাবে অনুধাবন করতে হবে।

তিনি বলেন, বাংলাদেশে দুই-তৃতীয়াংশ মানুষের ম্যান্ডেট নিয়ে নির্বাচিত সরকারের সাথে ভারত কী ধরনের সম্পর্কের ভিত্তি তৈরি করতে চায়— তা নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন। জাতীয় স্বার্থের বাইরে গিয়ে কোনো তাড়াহুড়ো করে শীর্ষ সফর করার কোনো যুক্তি নেই। সুনির্দিষ্ট বিষয়ে উভয় দেশের ঐকমত্য এবং সম্মানজনক আমন্ত্রণ প্রস্তাবের ভিত্তিতে উপযুক্ত পরিবেশ তৈরি হওয়া ছাড়া আসন্ন ব্রিকস সম্মেলনের আগে প্রধানমন্ত্রীর ভারত সফরের সম্ভাবনা অনেকটা ক্ষীণ। আরও পড়ুনআরও পড়ুনরাষ্ট্রপতির ক্ষমতা কতটুকু, বেতন–ভাতাসহ যেসব সুবিধা পান

‘শেখ হাসিনাকে স্পেস দেওয়া গণতান্ত্রিক শিষ্টাচার পরিপন্থি’

বাংলাদেশের আদালতে দণ্ডপ্রাপ্ত ও পলাতক আসামিদের ভারতীয় ভূখণ্ড ব্যবহার করে রাজনৈতিক বা প্রচারমাধ্যমে স্পেস দেওয়ার ঘটনায় গভীর ক্ষোভ প্রকাশ করেন পররাষ্ট্র উপদেষ্টা। তিনি বলেন, বাংলাদেশে দেড় হাজারের বেশি মানুষের আত্মত্যাগের মধ্য দিয়ে জুলাই গণঅভ্যুত্থানে স্বৈরাচারী শাসনের পতনের পর অপরাধী হিসেবে ভারতে পালিয়ে গিয়ে আশ্রয় নেওয়া, ফ্যাসিবাদী শেখ হাসিনাকে সেখানে রাজনৈতিক কিংবা মিডিয়াতে কথা বলার সুযোগ দেওয়া ভারতের গণতান্ত্রিক শিষ্টাচার পরিপন্থি।

প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা স্পষ্ট করে বলেন, ভারতের ভূখণ্ড ব্যবহার করে বাংলাদেশের বিরুদ্ধে যেকোনো অস্থিতিশীল তৎপরতা চালানো কিংবা দণ্ডপ্রাপ্ত কোনো ব্যক্তি, সন্ত্রাসী বা খুনিকে স্পেস দেওয়ার ঘটনা বাংলাদেশের কোটি কোটি মানুষকে গভীরভাবে ক্ষুব্ধ করেছে। আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক নিয়ম অনুযায়ী দিল্লি এটিকে কোনোভাবেই যৌক্তিক প্রমাণ করতে পারে না। সেইসাথে তা কোনো অবস্থাতেই মতপ্রকাশের স্বাধীনতার অজুহাতে জাস্টিফাই করা যায় না। এ বিষয়ে দ্বিপক্ষীয় ও আন্তর্জাতিক আইনি দায়বদ্ধতার কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে সরকার ইতোমধ্যে নয়াদিল্লির কাছে কূটনৈতিক প্রতিবাদ জানিয়েছে। ভবিষ্যতে যেকোনো বাংলাদেশ বিরোধী অপতৎপরতা বন্ধে কূটনৈতিক চাপ অব্যাহত থাকবে।আরও পড়ুনআরও পড়ুনপৌর চেয়ারম্যান থেকে রাষ্ট্রপতি– মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের রাজনৈতিক জীবন

আঞ্চলিক জোট ও কৌশলগত ভারসাম্য

বর্তমান সরকারের ‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’ নীতির কথা উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্র উপদেষ্টা বলেন, ‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’ নীতিকে সামনে রেখে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ভারসাম্যমূলক পররাষ্ট্রনীতি বজায় রাখছে বর্তমান সরকার। বিশ্ব অর্থনীতি ও বাণিজ্য বজায় রাখার ক্ষেত্রে সৌদি আরব, পাকিস্তান ও তুরস্কের সমন্বয়ে গঠিত সম্ভাব্য অর্থনৈতিক বা প্রতিরক্ষা ফ্রেমওয়ার্কে যুক্ত হওয়া নিয়ে বাংলাদেশ তার নিজস্ব স্বার্থ বিবেচনা করেই ইতিবাচক অবস্থানে রয়েছে।

উপদেষ্টা আরও বলেন, সৌদি আরবের ক্রাউন প্রিন্স ও দেশটির প্রধানমন্ত্রী মোহাম্মদ বিন সালমানের আমন্ত্রণে গ্রীষ্মকাল অতিবাহিত হওয়ার পরপরই প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের রিয়াদ সফর চূড়ান্ত হতে যাচ্ছে। অন্যদিকে, পাকিস্তানের সাথে স্বাভাবিক কাজের অংশ হিসেবে ওয়ার্কিং বাইল্যাটারাল রিলেশনশিপ, বাণিজ্য ও দ্বিপক্ষীয় পিপল-টু-পিপল কানেক্টিভিটি জোরদার করা হচ্ছে। আরও পড়ুনআরও পড়ুনরাষ্ট্রপতি নির্বাচনে ভোট দেননি যারা

পশ্চিমা বিশ্ব ও চীনের সাথে অর্থনৈতিক কূটনীতি

প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্র উপদেষ্টা বলেন, অর্থনৈতিক কূটনীতির অংশ হিসেবে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) সাথে বাণিজ্যিক সম্পর্ক আরও জোরদার করা হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের সরকারি-বেসরকারি খাতের সাথে সয়াবিন আমদানি ও বোয়িং বিমান ক্রয়ের আলোচনা এগোনোর পাশাপাশি ট্রেড ভলিউম বাড়ানোর প্রচেষ্টা অব্যাহত রয়েছে। পাশাপাশি ইইউ’র সাথে ট্রেড অ্যান্ড পার্টনারশিপ এগ্রিমেন্টের সুনির্দিষ্ট আলোচনা শুরু হয়েছে।

চীনের সাথে কৌশলগত সম্পর্ক জোরদার প্রসঙ্গে উপদেষ্টা বলেন, বেইজিংয়ের সাথে সম্পর্ক এখন এক নতুন উচ্চতায় উন্নীত হয়েছে। ভূ-রাজনৈতিক চাপ এড়িয়ে চীনের সাথে ‘টু প্লাস টু’ মেকানিজম এবং কম্প্রিহেন্সিভ পার্টনারশিপের আওতায় বাংলাদেশকে বিশেষ অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে। চীনের সরাসরি বৈদেশিক বিনিয়োগ (এফডিআই) আকর্ষণের বিষয়টি জোরালো আলোচনা চলছে। পাশাপাশি যুক্তরাজ্যের সাথে ডায়াসপোরা কমিউনিটি ও রেমিট্যান্স প্রবাহ বৃদ্ধিতে বিশেষ কূটনৈতিক জোর দেওয়া হচ্ছে। আরও পড়ুনআরও পড়ুন৭০ অনুচ্ছেদে পরিবর্তন এনেই পরবর্তী রাষ্ট্রপতি নির্বাচন: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী

আফ্রিকায় নতুন বাজার ও মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার

আন্তর্জাতিক মঞ্চে বাংলাদেশের প্রতি গভীর আস্থার চিত্র তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রীর এই উপদেষ্টা বলেন, সম্প্রতি জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের প্রেসিডেন্সি নির্বাচনে আফ্রিকার ৫৪টি দেশের মধ্যে ৫২টি দেশই বাংলাদেশকে সমর্থন দিয়েছে। আফ্রিকান ব্লকের সাথে এই ঘনিষ্ঠতাকে কাজে লাগিয়ে খুব শিগগিরই বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীসহ উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদল আফ্রিকা সফর করবেন। সেখানে কন্ট্রাক্ট ফার্মিং এবং বাংলাদেশি পণ্যের নতুন রফতানি বাজার গড়ে তুলতে একাধিক দ্বিপক্ষীয় চুক্তি সই হবে।

অন্যদিকে, দীর্ঘদিন ধরে আটকে থাকা মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার নিয়ে সুখবর দেন পররাষ্ট্র উপদেষ্টা। তিনি জানান, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ও মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রীর ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি ও সফল দ্বিপক্ষীয় আলোচনার ফলে বরফ গলতে শুরু করেছে। খুব শিগগিরই জটিলতা কাটিয়ে মালয়েশিয়ায় বাংলাদেশি কর্মী গমনের পথ উন্মোচিত হবে।আরও পড়ুনআরও পড়ুননতুন রাষ্ট্রপতিকে লাল গোলাপের শুভেচ্ছা জানালেন প্রধানমন্ত্রী

জাতিসংঘে ঐতিহাসিক জয় ও রোহিঙ্গা সংকট নিরসন

জাতিসংঘের ৮১তম সাধারণ পরিষদের সভাপতি পদে বাংলাদেশের ঐতিহাসিক জয় মূলত প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতা, লিডারশিপ কোয়ালিটি এবং সরকারের প্রগ্রেসিভ গণতান্ত্রিক ইমেজেরই বৈশ্বিক স্বীকৃতি। উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির আশাবাদ ব্যক্ত করে বলেন, জাতিসংঘের এই প্রেসিডেন্সি প্ল্যাটফর্মকে কাজে লাগিয়ে বিশ্বমঞ্চে নীতিভিত্তিক পররাষ্ট্রনীতির আদর্শ তুলে ধরা হবে। একইসঙ্গে মিয়ানমার ও চীনসহ আন্তর্জাতিক অংশীদারদের ওপর সুনির্দিষ্ট আর্থিক ও কূটনৈতিক চাপ তৈরি করে রোহিঙ্গা সংকটের একটি স্থায়ী ও মর্যাদাপূর্ণ সমাধানের চেষ্টা জোরদার করা হবে।

পররাষ্ট্র উপদেষ্টা আরও বলেন, সরকারের গত ১৮০ দিনে একটি সুদৃঢ় ফরেন পলিসি ফ্রেমওয়ার্ক তৈরি করা সম্ভব হয়েছে। জাতিসংঘে বাংলাদেশের জয় এবং সরকারের গৃহীত কূটনৈতিক নীতিগুলো প্রমাণ করে— একটি গণতান্ত্রিক সরকার কতটা দ্রুত আন্তর্জাতিক পর্যায়ে দেশের হারানো ভাবমূর্তি ও সার্বভৌম মর্যাদা পুনঃপ্রতিষ্ঠা করতে পারে।

উল্লেখ্য, পররাষ্ট্র উপদেষ্টা হুমায়ুন কবিরের আধুনিক ডিপ্লোমেসির মূল শক্তি তার সমৃদ্ধ আন্তর্জাতিক পটভূমি। সিলেটের ওসমানীনগরের সন্তান হুমায়ুন কবির যুক্তরাজ্যে বেড়ে ওঠেন। তিনি যুক্তরাজ্যের ইউনিভার্সিটি অব সাসেক্স থেকে আন্তর্জাতিক সম্পর্কে স্নাতকের পর লন্ডন স্কুল অব ইকোনমিক্স অ্যান্ড পলিটিক্যাল সায়েন্স (এলএসই), কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয় ও লিডস ল' স্কুল থেকে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি সম্পন্ন করেন। পেশাগত জীবনে তিনি বরিস জনসন, লিজ ট্রাস ও ঋষি সুনাকের মতো যুক্তরাজ্যের তিন তিনজন প্রধানমন্ত্রীর সাথে কাজ করেছেন। এছাড়াও সাবেক প্রধানমন্ত্রী লিজ ট্রাসের প্রাইভেট সেক্রেটারি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

বিষয় : বিএনপি

বাংলা ইনসাইড

মঙ্গলবার, ০৩ নভেম্বর ২০২৬


‘পারস্পরিক আস্থা’ অর্জনের পর প্রধানমন্ত্রীর ভারত সফর অনুষ্ঠিত হতে পারে: হুমায়ুন কবির

প্রকাশের তারিখ : ২০ আগস্ট ২০২৬

featured Image

প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্র বিষয়ক উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির বলেছেন, তাড়াহুড়ো করে নয়; বরং দুই দেশের মধ্যে পারস্পরিক আস্থা, বিশ্বাস, সার্বভৌমত্বের প্রতি শ্রদ্ধা, কূটনৈতিক আলাপ-আলোচনা এবং সম্মানজনক আমন্ত্রণ প্রস্তাবের ভিত্তিতে উপযুক্ত পরিবেশ তৈরি হলেই প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ভারত সফর অনুষ্ঠিত হতে পারে।

তিনি জানান, আগামী ১২-১৩ সেপ্টেম্বর ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লিতে অনুষ্ঠেয় ব্রিকস সম্মেলনের আগে প্রধানমন্ত্রীর সফর নিয়ে ভারতীয় গণমাধ্যমে গুঞ্জন থাকলেও সুনির্দিষ্ট জাতীয় স্বার্থ ও ঐকমত্য ছাড়া বাংলাদেশ এই মুহূর্তে কোনো তাড়াহুড়ো না করার নীতি গ্রহণ করেছে। 

গত ১৭ আগস্ট রাজধানীর মিন্টু রোডের সরকারি বাসভবনে রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা বাসস’কে দেওয়া একান্ত বিশেষ সাক্ষাৎকারে প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্র উপদেষ্টা ও বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব (আন্তর্জাতিক বিষয়ক) হুমায়ুন কবির এসব কথা বলেন। 

সাক্ষাৎকারে তিনি ভারত-বাংলাদেশ দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক, নতুন আন্তর্জাতিক জোটের সমীকরণ, যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের সাথে কৌশলগত সম্পর্ক, মালয়েশিয়ায় বন্ধ থাকা শ্রমবাজার চালু, পররাষ্ট্রনীতির মূল অগ্রাধিকারগুলোর অগ্রগতি নিয়ে বিস্তারিত কথা বলেন। আরও পড়ুনআরও পড়ুন২৩তম রাষ্ট্রপতি হলেন মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর

পারস্পরিক আস্থা ও ভারত সফর

ভারতীয় গণমাধ্যমে প্রচারিত প্রধানমন্ত্রীর সফর সংক্রান্ত খবরগুলোকে জল্পনা-কল্পনা আখ্যা দিয়ে পররাষ্ট্র উপদেষ্টা বলেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ভারত সফর নিয়ে ভারতীয় গণমাধ্যমের খবরগুলো ভিত্তিহীন ও অনুমাননির্ভর। দুই দেশের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক ও বাংলাদেশের সরকারপ্রধানের শীর্ষ পর্যায়ের সফরের বিষয়টি ভারতের বর্তমান নেতৃত্বের মাইন্ডসেট (মানসিকতা) বা দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তনের ওপর নির্ভর করছে। দেড় হাজারের বেশি মানুষের আত্মত্যাগের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশে সংঘটিত জুলাই গণঅভ্যুত্থানের বাস্তবতাকে প্রতিবেশী দেশকে সঠিকভাবে অনুধাবন করতে হবে।

তিনি বলেন, বাংলাদেশে দুই-তৃতীয়াংশ মানুষের ম্যান্ডেট নিয়ে নির্বাচিত সরকারের সাথে ভারত কী ধরনের সম্পর্কের ভিত্তি তৈরি করতে চায়— তা নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন। জাতীয় স্বার্থের বাইরে গিয়ে কোনো তাড়াহুড়ো করে শীর্ষ সফর করার কোনো যুক্তি নেই। সুনির্দিষ্ট বিষয়ে উভয় দেশের ঐকমত্য এবং সম্মানজনক আমন্ত্রণ প্রস্তাবের ভিত্তিতে উপযুক্ত পরিবেশ তৈরি হওয়া ছাড়া আসন্ন ব্রিকস সম্মেলনের আগে প্রধানমন্ত্রীর ভারত সফরের সম্ভাবনা অনেকটা ক্ষীণ। আরও পড়ুনআরও পড়ুনরাষ্ট্রপতির ক্ষমতা কতটুকু, বেতন–ভাতাসহ যেসব সুবিধা পান

‘শেখ হাসিনাকে স্পেস দেওয়া গণতান্ত্রিক শিষ্টাচার পরিপন্থি’

বাংলাদেশের আদালতে দণ্ডপ্রাপ্ত ও পলাতক আসামিদের ভারতীয় ভূখণ্ড ব্যবহার করে রাজনৈতিক বা প্রচারমাধ্যমে স্পেস দেওয়ার ঘটনায় গভীর ক্ষোভ প্রকাশ করেন পররাষ্ট্র উপদেষ্টা। তিনি বলেন, বাংলাদেশে দেড় হাজারের বেশি মানুষের আত্মত্যাগের মধ্য দিয়ে জুলাই গণঅভ্যুত্থানে স্বৈরাচারী শাসনের পতনের পর অপরাধী হিসেবে ভারতে পালিয়ে গিয়ে আশ্রয় নেওয়া, ফ্যাসিবাদী শেখ হাসিনাকে সেখানে রাজনৈতিক কিংবা মিডিয়াতে কথা বলার সুযোগ দেওয়া ভারতের গণতান্ত্রিক শিষ্টাচার পরিপন্থি।

প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা স্পষ্ট করে বলেন, ভারতের ভূখণ্ড ব্যবহার করে বাংলাদেশের বিরুদ্ধে যেকোনো অস্থিতিশীল তৎপরতা চালানো কিংবা দণ্ডপ্রাপ্ত কোনো ব্যক্তি, সন্ত্রাসী বা খুনিকে স্পেস দেওয়ার ঘটনা বাংলাদেশের কোটি কোটি মানুষকে গভীরভাবে ক্ষুব্ধ করেছে। আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক নিয়ম অনুযায়ী দিল্লি এটিকে কোনোভাবেই যৌক্তিক প্রমাণ করতে পারে না। সেইসাথে তা কোনো অবস্থাতেই মতপ্রকাশের স্বাধীনতার অজুহাতে জাস্টিফাই করা যায় না। এ বিষয়ে দ্বিপক্ষীয় ও আন্তর্জাতিক আইনি দায়বদ্ধতার কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে সরকার ইতোমধ্যে নয়াদিল্লির কাছে কূটনৈতিক প্রতিবাদ জানিয়েছে। ভবিষ্যতে যেকোনো বাংলাদেশ বিরোধী অপতৎপরতা বন্ধে কূটনৈতিক চাপ অব্যাহত থাকবে।আরও পড়ুনআরও পড়ুনপৌর চেয়ারম্যান থেকে রাষ্ট্রপতি– মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের রাজনৈতিক জীবন

আঞ্চলিক জোট ও কৌশলগত ভারসাম্য

বর্তমান সরকারের ‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’ নীতির কথা উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্র উপদেষ্টা বলেন, ‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’ নীতিকে সামনে রেখে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ভারসাম্যমূলক পররাষ্ট্রনীতি বজায় রাখছে বর্তমান সরকার। বিশ্ব অর্থনীতি ও বাণিজ্য বজায় রাখার ক্ষেত্রে সৌদি আরব, পাকিস্তান ও তুরস্কের সমন্বয়ে গঠিত সম্ভাব্য অর্থনৈতিক বা প্রতিরক্ষা ফ্রেমওয়ার্কে যুক্ত হওয়া নিয়ে বাংলাদেশ তার নিজস্ব স্বার্থ বিবেচনা করেই ইতিবাচক অবস্থানে রয়েছে।

উপদেষ্টা আরও বলেন, সৌদি আরবের ক্রাউন প্রিন্স ও দেশটির প্রধানমন্ত্রী মোহাম্মদ বিন সালমানের আমন্ত্রণে গ্রীষ্মকাল অতিবাহিত হওয়ার পরপরই প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের রিয়াদ সফর চূড়ান্ত হতে যাচ্ছে। অন্যদিকে, পাকিস্তানের সাথে স্বাভাবিক কাজের অংশ হিসেবে ওয়ার্কিং বাইল্যাটারাল রিলেশনশিপ, বাণিজ্য ও দ্বিপক্ষীয় পিপল-টু-পিপল কানেক্টিভিটি জোরদার করা হচ্ছে। আরও পড়ুনআরও পড়ুনরাষ্ট্রপতি নির্বাচনে ভোট দেননি যারা

পশ্চিমা বিশ্ব ও চীনের সাথে অর্থনৈতিক কূটনীতি

প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্র উপদেষ্টা বলেন, অর্থনৈতিক কূটনীতির অংশ হিসেবে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) সাথে বাণিজ্যিক সম্পর্ক আরও জোরদার করা হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের সরকারি-বেসরকারি খাতের সাথে সয়াবিন আমদানি ও বোয়িং বিমান ক্রয়ের আলোচনা এগোনোর পাশাপাশি ট্রেড ভলিউম বাড়ানোর প্রচেষ্টা অব্যাহত রয়েছে। পাশাপাশি ইইউ’র সাথে ট্রেড অ্যান্ড পার্টনারশিপ এগ্রিমেন্টের সুনির্দিষ্ট আলোচনা শুরু হয়েছে।

চীনের সাথে কৌশলগত সম্পর্ক জোরদার প্রসঙ্গে উপদেষ্টা বলেন, বেইজিংয়ের সাথে সম্পর্ক এখন এক নতুন উচ্চতায় উন্নীত হয়েছে। ভূ-রাজনৈতিক চাপ এড়িয়ে চীনের সাথে ‘টু প্লাস টু’ মেকানিজম এবং কম্প্রিহেন্সিভ পার্টনারশিপের আওতায় বাংলাদেশকে বিশেষ অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে। চীনের সরাসরি বৈদেশিক বিনিয়োগ (এফডিআই) আকর্ষণের বিষয়টি জোরালো আলোচনা চলছে। পাশাপাশি যুক্তরাজ্যের সাথে ডায়াসপোরা কমিউনিটি ও রেমিট্যান্স প্রবাহ বৃদ্ধিতে বিশেষ কূটনৈতিক জোর দেওয়া হচ্ছে। আরও পড়ুনআরও পড়ুন৭০ অনুচ্ছেদে পরিবর্তন এনেই পরবর্তী রাষ্ট্রপতি নির্বাচন: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী

আফ্রিকায় নতুন বাজার ও মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার

আন্তর্জাতিক মঞ্চে বাংলাদেশের প্রতি গভীর আস্থার চিত্র তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রীর এই উপদেষ্টা বলেন, সম্প্রতি জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের প্রেসিডেন্সি নির্বাচনে আফ্রিকার ৫৪টি দেশের মধ্যে ৫২টি দেশই বাংলাদেশকে সমর্থন দিয়েছে। আফ্রিকান ব্লকের সাথে এই ঘনিষ্ঠতাকে কাজে লাগিয়ে খুব শিগগিরই বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীসহ উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদল আফ্রিকা সফর করবেন। সেখানে কন্ট্রাক্ট ফার্মিং এবং বাংলাদেশি পণ্যের নতুন রফতানি বাজার গড়ে তুলতে একাধিক দ্বিপক্ষীয় চুক্তি সই হবে।

অন্যদিকে, দীর্ঘদিন ধরে আটকে থাকা মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার নিয়ে সুখবর দেন পররাষ্ট্র উপদেষ্টা। তিনি জানান, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ও মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রীর ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি ও সফল দ্বিপক্ষীয় আলোচনার ফলে বরফ গলতে শুরু করেছে। খুব শিগগিরই জটিলতা কাটিয়ে মালয়েশিয়ায় বাংলাদেশি কর্মী গমনের পথ উন্মোচিত হবে।আরও পড়ুনআরও পড়ুননতুন রাষ্ট্রপতিকে লাল গোলাপের শুভেচ্ছা জানালেন প্রধানমন্ত্রী

জাতিসংঘে ঐতিহাসিক জয় ও রোহিঙ্গা সংকট নিরসন

জাতিসংঘের ৮১তম সাধারণ পরিষদের সভাপতি পদে বাংলাদেশের ঐতিহাসিক জয় মূলত প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতা, লিডারশিপ কোয়ালিটি এবং সরকারের প্রগ্রেসিভ গণতান্ত্রিক ইমেজেরই বৈশ্বিক স্বীকৃতি। উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির আশাবাদ ব্যক্ত করে বলেন, জাতিসংঘের এই প্রেসিডেন্সি প্ল্যাটফর্মকে কাজে লাগিয়ে বিশ্বমঞ্চে নীতিভিত্তিক পররাষ্ট্রনীতির আদর্শ তুলে ধরা হবে। একইসঙ্গে মিয়ানমার ও চীনসহ আন্তর্জাতিক অংশীদারদের ওপর সুনির্দিষ্ট আর্থিক ও কূটনৈতিক চাপ তৈরি করে রোহিঙ্গা সংকটের একটি স্থায়ী ও মর্যাদাপূর্ণ সমাধানের চেষ্টা জোরদার করা হবে।

পররাষ্ট্র উপদেষ্টা আরও বলেন, সরকারের গত ১৮০ দিনে একটি সুদৃঢ় ফরেন পলিসি ফ্রেমওয়ার্ক তৈরি করা সম্ভব হয়েছে। জাতিসংঘে বাংলাদেশের জয় এবং সরকারের গৃহীত কূটনৈতিক নীতিগুলো প্রমাণ করে— একটি গণতান্ত্রিক সরকার কতটা দ্রুত আন্তর্জাতিক পর্যায়ে দেশের হারানো ভাবমূর্তি ও সার্বভৌম মর্যাদা পুনঃপ্রতিষ্ঠা করতে পারে।

উল্লেখ্য, পররাষ্ট্র উপদেষ্টা হুমায়ুন কবিরের আধুনিক ডিপ্লোমেসির মূল শক্তি তার সমৃদ্ধ আন্তর্জাতিক পটভূমি। সিলেটের ওসমানীনগরের সন্তান হুমায়ুন কবির যুক্তরাজ্যে বেড়ে ওঠেন। তিনি যুক্তরাজ্যের ইউনিভার্সিটি অব সাসেক্স থেকে আন্তর্জাতিক সম্পর্কে স্নাতকের পর লন্ডন স্কুল অব ইকোনমিক্স অ্যান্ড পলিটিক্যাল সায়েন্স (এলএসই), কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয় ও লিডস ল' স্কুল থেকে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি সম্পন্ন করেন। পেশাগত জীবনে তিনি বরিস জনসন, লিজ ট্রাস ও ঋষি সুনাকের মতো যুক্তরাজ্যের তিন তিনজন প্রধানমন্ত্রীর সাথে কাজ করেছেন। এছাড়াও সাবেক প্রধানমন্ত্রী লিজ ট্রাসের প্রাইভেট সেক্রেটারি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।


বাংলা ইনসাইড

সম্পাদনা: আনোয়ার সাদাৎ
কপিরাইট © ২০২৬ । সর্বস্ব সংরক্ষিত বাংলা ইনসাইড